loader image

রক্তস্নাত বরষা

                 সময়টা শ্রাবণের মাঝামাঝি। সারাদিন কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে থাকে, আর কিছু সময় পর পরই ঝুম                         ঝুম আওয়াজ তুলে বৃষ্টি নামে।

বৈরি এই আবহাওয়ায় ক্যাম্পের ভিতর তার অন্যান্য সঙ্গীদের সাথে বসে রয়েছে বিপলু। ১১ বছরের একজন সদ্য কিশোর হওয়া সত্ত্বেও দেশমাতৃকার টানে মায়ের কোল ছিঁড়ে চলে এসেছে রণক্ষেত্রে । আজ বিপলুর কেন জানি মন খারাপ। আকাশের একটানা ক্রন্দন তার বিষন্নতার মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। মা আর ছোট বোনটির কথা খুব মনে পড়ছে তার। এরকম বৃষ্টিতে খুব মজা করে খিঁচুড়ি রান্না করতো তার মা। ভাবলো, অনেকদিন তো খোঁজ নেয় না। একটা চিঠি লিখি মা আর বোনের জন্য। চিঠি লেখার মানসে বৈরি এই আবহাওয়ার মধ্যেই সাদা পৃষ্টা আর কলম নিয়ে বসে গেলো । ভালোবাসারর এক অপূর্ব উপ্যাখান রচনা করে চলেছে এই কিশোর। এতক্ষণ যেনো অন্য জগৎে ছিলো বিপলু। সম্ভিত ফিরে পেলো কমান্ডার মতির ডাকে।

– একটু এদিক আয় তো, বিপলু।
– আসছি, ভাইজান।

চিঠিটি বুকপকেটে ভাঁজ করে সে গিয়ে দেখলো, কমান্ডার সবাইকে নিয়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই মিটিং করছে ক্যাম্পের বাইরে।

– আমগো তৈয়ার হতি হবে। বরষার মাঝেই অপারেশন করুম। খবর আসিছে, পাকেরা আরও বড় করি তুলতিছে তাগো ঘাঁটি। এভাবে হলি তো আর পারায় যাবে না। আজ-কালই অপারেশনে যামু, বললেন কমান্ডার মতি।

– ভাইজান, আমাদের তো গোলা-বারুদ কম। তাদের বিশাল সব কামান-সামান, বলে উঠে মাহবুব।

– বিশ্বাস রাখ নিজেদের উপরে। হয় মারুম, নয় মরুম। দেশ স্বাধীন না করে যামুনা ঘরে।

সবাই কমান্ডারের কথাই মাথা নাড়লো। বিদ্রোহের অনল জ্বলছে সবার দেহে। বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টি যেন তাদের ক্রোধের মাত্রাকে বাড়িয়ে তুললো আরও। বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ায় সবাই ক্যাম্পের ভিতর এসে বসলো।

সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলো, কালই পাকিস্তানিদের শক্ত ঘাঁটি শাহবাজপুর অপারেশনে যাবে। কমান্ডার মতি বিপলুকে রেকি করে আসার জন্য নির্দেশ দিলো।

– সাবধানে থাহিস। ঠিকঠাক দেইহা আসিছ সব।
– আইচ্ছা,ভাইজান।

বৃষ্টি পড়ায় চারদিকে কাঁদা আর পানিতে একাকার অবস্থা । বৃষ্টি যদিও পড়ছেনা এখন, তথাপি বিপলুর পথ চলতে কষ্ট হচ্ছে। পা দেবে যাচ্ছে, নয়তো পিছলিয়ে যাচ্ছে। বিপলুর গান ধরতে খুব ইচ্ছে করে । বৃষ্টির দিনগুলোতে গানের গলা ভালো হওয়ায় গান করতে বলতেন। সে গান ধরে,

” তীঁরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিবো রে,
আমরা কজন নবীণ মাঝি, হাল ধরেছি
শক্ত করে রে ।

পাক ক্যাম্পের কাছাকাছি চলে আসায় সতর্ক হলো বিপলু। তীক্ষ্ণভাবে সব পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। ক্যাম্পের আর একটু কাছে যেতেই বিপলুর নজরে পড়ে পাকদের উন্মত্ত উল্লাস আর নারী কন্ঠের আহাজারি। ক্রোধে থর থর করে কাঁপতে থাকে সে। চোখ থেকে বের হওয়া অগ্নি স্ফুলিঙ্গ পাকদের ঠিকরে খায়।

সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে এসে কমান্ডারের কাছে রিপোর্ট দেয় বিপলু। বিপলুর রিপোর্ট মোতাবেক অপারেশনের ছক তৈরি করা শুরু করে কমান্ডার মতি ও তার সহযোদ্ধারা। ক্রোধের অনলে পাকদের ধ্বংস করার নেশায় উন্মত্ত লাল-সবুজের জন্য লড়াই করা বীরযোদ্ধারা।

পরদিন ভোর রাতে শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এই সময়েই আক্রমণ শুরু করার জন্য নিজ নিজ বাংকারে অবস্থান নেয় কমান্ডার মতি, কিশোর যোদ্ধা বিপলু ও তাদের সহযোদ্ধারা। কমান্ডার মতির নির্দেশেই পাকক্যাম্পের সামনে আচমকা চারটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় মুক্তিবাহিনী। পরক্ষণেই ওপাশ থেকে শুরু হয় পাল্টা আক্রমণ। মুক্তিবাহিনীও চালাতে থাকে গুলি । এরই মধ্য কয়েকজন পাক ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। বিপলুর বিস্ফোরিত বোমায় ক্ষতিগ্রস্থ হয় পাকদের অস্ত্রাগার।

গুলি আর বোমা বিস্ফোরণের শব্দ ছাপিয়ে যায় তুমুল বৃষ্টির শব্দকে। দু’পক্ষের মধ্য তুমুল যুদ্ধ চলতে থাকে এই তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই । হঠাৎ একটি গুলি এসে ঝাঁঝরা করে দেয় কমান্ডার মতির দেহ। রক্তস্রোতে ভেসে ঢলে পড়ে সে। বিপলু তার কাছে আসতেঈ বলে,

– যুদ্ধ কর! যুদ্ধ! যুদ্ধ! জয় আমাদের হবেই!

অস্ফুট স্বরে কথাগুলো বলেই ওপারে পাড়ি দিলো কমান্ডার মতি। মতির অস্ত্র তুলে নিয়ে প্রাণপণে গুলি চালাতে থাকে বিপলু। পাকদের রক্তের নেশায় পাগল হয়ে গিয়েছে সে। এগারো বছরের একজন দেশপ্রেমিকের হাতে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে হায়েনারা। সহযোদ্ধারাও প্রাণপণে লড়ছে তার এই সাহসিকতা দেখে। তুমুল বৃষ্টি আর গগণবিদারী চিৎকার যেন আরও আলোড়িত করছে মুক্তিপাগল এই যোদ্ধাদের।

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছে পাকবাহিনী। শাহবাজপুর দখল হতে লাগবে আর কিছু সময়। চোখেমুখে স্বপ্ন আর দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত বিপলু “জয় বাংলা” বলে বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতেই উড়ে গেলো পাকক্যাম্প । পরক্ষণেই শত্রুর গুলি ভেদ করলো বিপলু দেহ। পাল্টা গুলিতে শেষ শত্রুকে ঘায়েল করে সে শত্রুমুক্ত করলো শাহবাজপুর ঘাঁটি।

রক্তে রঞ্জিত দেহ নিয়ে বিপলু কাঁপা কাঁপা হাতে লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করতে না করতেই তার দেহ মাটিতে আঁচড়ে পড়লো। এই বরষায় রক্তের মিছিলে শামিল হয়ে স্বাধীন একটি বাংলার স্বপ্ন দেখে ওপারে পাড়ি জমায় বীর এই কিশোর যোদ্ধা।

সে চলে যায়। বরষার ভেজা কর্দমাক্ত মাটি তার
রক্তে লাল হয়ে থেকে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *